INTRODUCING 5 - days-a-week problem solving session for Math Olympiad and ISI Entrance. Learn More 

February 20, 2019

কল্পনার গোল্লাছুটে যুক্তির দরবেশ!

International Mother Language Day special... and excursion in mathematical reason and imagination 

শোভাবাজারের মিত্র কাফেতে গিয়ে বসলাম। 'একটা পরোটা মাটন দিন দাদা'।

সময়টা ১৯৭৬ এর ফেব্রুয়ারি মাস। বাইরে তখনো একটু শীত শীত ভাব। হাতা গুটিয়ে পরোটায় হাত লাগাতে যাবো! এমনি সময় মোবাইলটা ট্যাঁ ট্যাঁ করতে শুরু করল।

মন দিয়ে পাঁঠা খাবো তার জো নেই এই দুনিয়ায়! নিউইয়র্ক থেকে সুমন্ত্র ফোন করছে।

ওখানে ও বছরখানেক হল রাজমিস্ত্রির কাজ করছে। বেশ টাকাও করে ফেলেছে। শনিবার রাত হলেই প্রচুর মদ্যপান করে। আর ফোন লাগায়। টাকা দিয়ে তো আর একাকীত্ত্ব ঘোচানো সম্ভব নয়।

'কি ভাই ইন্দিরা গান্ধী কি বলছে?'

ভিডিও কল। স্কাইপে। বুঝলাম পুরো খেজুর করার মুডে আছে খোকা।

'দুত্তোর ইন্দিরা গান্ধী! এখন তো সঞ্জয় গান্ধীর যুগ। সদ্য ভবিষ্যৎএর ভুতের প্রিন্ট গুলো ন্যানোর কারখানায় গিয়ে পুড়িয়ে এসেছেন জুনিয়ার গান্ধী।'

মিত্র কাফের লোকজন ততক্ষণে আমার দিকে এগিয়ে এসেছে।

' দাদা আপনার হাতের তেলোয় ও কি? কাঁচের মধ্যে দিয়ে আরেকটা মানুষ দেখা যাচ্ছে যে।'

আমি পাঁঠার টুকরো মুখে পুরতে পুরতে প্রফেটিক হাসি হাসলাম, ' Any sufficiently advanced technology is indistinguishable from magic.'

আর্থার সি ক্লার্ক বলেছিলেন সেই কবে। তারপর এই আমি বল্লাম।

পরের দিন দৈনিক যুগান্তরে হেডলাইন হল,

'উত্তর কলকাতায় কাঁচের মধ্যে দিয়ে দশ হাজার মাইল দূরের মানুষের সহিত কথা বলা যাইতেছে'

যথেষ্ট উন্নতমানের প্রযুক্তি খানিকটা ম্যাজিকের মত। আমরা ব্যবহার করতে করতে ভুলে যাই যে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও এ সমস্ত অকল্পনীয় ছিল।

নিবিড় গণিতও খানিকটা ম্যাজিকের মত। তবে তাকে মনের চোখ দিয়ে দেখতে হয়। আমি গণিত করতে করতে এমন অনেক সত্যের মুখোমুখি হয়েছি , যা কল্পনাতেও আনা শক্ত। এ অনেকটা চাঁদের পাহাড়ের শঙ্করের মত। অনেক খাটাখাটনি করলে তবে পৌঁছনো যাবে সেই দেশে। একবার পৌঁছতে পারলে মনের চোখ ধাঁধিয়ে যাবে নির্ঘাত!

এরকম দু একটা অকল্পনীয় কল্পনার গল্প করতে বসেছি আজ।

যারা অঙ্ক বিন্দুমাত্র জানেন না, জানতে চান না, তাদেরও এই অবিশ্বাস্য যুক্তির মায়ার খেলা শুনতে ভালো লাগতে পারে।

১। অসীম অসংখ্য! (ক্যান্টর)

ক্যান্টর বললেন অসীম ব্যাপারটা কোনো একটা ব্যাপার নয়!

রবি ঠাকুর যখন গেয়ে ওঠেন, 'তোমার অসীমে প্রাণ মনে লয়ে', আমরা বুঝি অসীম ব্যাপারটা মস্ত ব্যাপার! একটা না শেষ হওয়ার গল্প।

কিন্তু কখনো কি ভাবি যে অসীমেরও ছোটো - বড় হতে পারে?

সে আবার কেমন? অসীম তো অসীমই! তার মধ্যে আবার মাত্রা ভেদ আছে নাকি?

এমনই এক অকল্পনীয় গল্প শুনিয়েছিলেন ক্যান্টর। ততকালীন গণিতজ্ঞরাও তাকে পাগল বলেছিল। অথচ এখন গোটা দুনিয়াই তার তত্ত্ব মেনে নিয়েছে।

ব্যাপারটা কি?

ক্যান্টর বললেন 'কতজন লোক সিনেমা দেখছে বুঝবে কি করে? জনে জনে গুনতে পারো। কিন্তু সে খুব কঠিন কাজ। হয়ত তুমি গুনতে শুরু করলে, আর কয়েকজন বাথরুমে চলে গেল। কেউ হয়ত হল ছেড়ে চা-তেষ্টা মেটাতে দেউরিতে গেলো। এই হাঙ্গামার মধ্যে নিঁখুত ভাবে গুনবে কি করে?

এক কাজ করো।

টিকিট বইটা দেখে নাও।

ব্যাস! যতগুলো টিকিট বিক্রি হয়েছে ততজনই দেখতে ঢুকেছে।

গোনাগুনতির এই পদ্ধতিকে 'বাইজেকশন' বলে। দুটো সেটের মধ্যে একই সংখ্যক বস্তু আছে কিনা বুঝতে হলে, দুটো সেটকে এমন ভাবে মেলানো যাচ্ছে কিনা দেখতে হবে।

যদি যায় তবে কেল্লাফতে। দুটোর মধ্যেই একই সংখ্যক বস্তু আছে।

এবার ক্যান্টর বললেন, 'গোটা সংখ্যা (1, 2, 3, 4...) যে অসীম সে আমরা সবাই জানি। কিন্তু যত গুলো জোড় সংখ্যা (2, 4, 6, 8...) আছে, গোটা সংখ্যাও ঠিক ততগুলো'।

তুমি তো রেগে কাঁই!

'সে কেমন ভাবে হবে? বিজোড় গুলো বাদ গেল যে।'

ক্যান্টর বলবেন, 'ও ভাবে নয়। মিলিয়ে দেখো'।

কি করে? বেশ। যদি x একটা গোটা সংখ্যা হয়, তার সাথে মিলিয়ে দাও 2x কে! এবার দেখো একটা নিয়ম পেলে। প্রতিটা গোটা সংখ্যার জন্য একটা করে জোড় সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে।

কি অদ্ভুত! বিজোড় গুলো তবে গেল কই?

এই যে তোমারও অদ্ভুত লাগছে এটাই মজা! কল্পনা পৌঁছতে পারছে না। ইন্টিউশন ফেল মেরে দিচ্ছে। এই আঁধারে যষ্টি হল একমাত্র 'reason'!

ক্যান্টর আরেকটু এগিয়ে বল্লেন, 'গোটা সংখ্যার চেয়ে গুঁড়ো সংখ্যা (real numbers) নির্ঘাত বেশি।'

কেন বাপু? দুটোই অসীম।

ক্যান্টর স্রেফ যুক্তি দিয়ে বলে দিলেন যে সে দুটো সেটকে 'মিলিয়ে দেখার' কোনো নিয়ম খুঁজেই পাওয়া যাবে না।

মিলিয়ে দেখার কোনও একটা নিয়ম খুঁজে বার করা তুলনামূলক ভাবে সহজ কাজ। কিন্তু কখনোই কোনও নিয়ম পাওয়া যাবে না! এ বড় কঠিন প্রস্তাব।

ক্যান্টরের যুক্তি জালের কথা আর বললাম না এখানে। যদি তুমি এ লেখা পড়ে সেসব খোঁজার চেষ্টা করো তাহলে বেশ হয়।

২। রাস্তাগুলোই সীমান্ত (গ্রোমোভ)

ভারতের সীমান্ত কোথায়?

গ্রোমোভকে বললে একটা অদ্ভুত উত্তর পাবে। গ্রোমোভ বলবেন, 'যে কোনো জায়গা থেকে শুরু করো। যেমন নিশ্চিন্দিপুর।'

বেশ!

'সেখানে থেকে যে কটা সিধে রাস্তা বেড়িয়েছে, মনে মনে তাদের একজোট করো।'

'করলাম'।

ব্যাস। কাম শেষ। এই একজোটে যাদের পেলে তারাই সীমান্ত।

ধাঁধা লেগে যাবে এসমস্ত শুনতে। এমনও হয়?

গ্রোমোভ পরশুরাম সম ঔদাসীন্যে বলবেন, 'হয়,Zআনতি পার না'

নিশ্চিন্দিপুর থেকে নির্গত সোজা পথগুলো (geodesic rays) -কে দিয়ে একটা সেট (set) বানানো যায়। গ্রোমোভ যুক্তিজাল বিস্তার করে দেখিয়েছিলেন যে এই সেট-টা একদম space -এর সীমান্তের মতই। একধরণের বিশেষ জগৎ-এ (space-এ) এমনটা হয়। সে জগৎ-এর নাম হল Delta hyperbolic space।

সে কেমন জগৎ?

বড়ই অদ্ভুতুরে। সেখানে একটা লাইনের সমান্তরাল অসীম সংখ্যক লাইন আঁকা যায়। আরো জানতে হলে যুক্তির সেই সুন্দর বাগানে পৌঁছে যেতে হবে। তার জন্য খাটতেও হবে খুব।

৩। আমার পথ চলাতেই আনন্দ (মাধবাচার্য্য)

কেরল দেশের মাধবাচার্য্য বললেন, 'গন্তব্য বলে কিছু নেই বাপু। পথটাই গন্তব্য।'

সে আবার কেমনতর কথা?

ধরো তুমি গুটি গুটি পায়ে শ্যামবাজারের দিকে হাঁটা দিলে। প্রথম ঘন্টায় অর্ধেক পথ গেলে। দ্বিতীয় ঘন্টায় বাকি অর্ধেকের অর্ধেক গেলে। অর্থাৎ মোট পথের ১/৪ ভাগ গেলে। পরের ঘন্টায় তারও অর্ধেক গেলে। এমনি করে তোমার 'চলা' চলতে থাকল।

গ্রীক দার্শনিক Zeno এই নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু করেছিলেন। মাধবাচার্য্য অবশ্য সেসব ধার দিয়েও গেলেন না। উনি পষ্ট বললেন যে এই পথ চলাটাই হল শ্যামবাজার!

এমন করে ভাবতে গেলে সুবিধাই বা কি, অসুবিধাই বা কি?

আসলে এমনি ভাবে হাঁটতে গেলে অসীম সংখ্যক ঘন্টা কেটে যাবে (infinite sequence পাওয়া যাবে)। চলার ভঙ্গীটা যদি একটু বিশেষ ধরণের হয় তবে এই অসীম পদক্ষেপের মধ্যে নিহিত থাকবে একটি মাত্র গন্তব্য। এই যেমন একটু আগে বল্লাম। ঘন্টা যতই কাটুক, প্রতি ধাপে জড়িয়ে আছে শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার ইঙ্গিত!

এমন করে যে কোনো সসীম সংখ্যাকে অসীম সংখ্যার মালা হিসেবে ভাবা যায়। সংখ্যামালা হচ্ছে সেই পথ। আর সসীম সংখ্যাটি হল গন্তব্য।

যেমন ধরো ১।

১ যদি গন্তব্য হয়, তাহলে পথ হতে পারে 0.9, 0.99, 0.999, 0.9999... । এই সংখ্যামালায় অসীম সংখ্যক সংখ্যা আছে। কিন্তু উপান্তে দাঁড়িয়ে আছে ১!

কিন্তু এমন করে ভাবব কেন?

কারণ যদি উপান্তে কে আছে নাও জানা থাকে, পথটাকেই সেই গন্তব্যের প্রতীক বলে ভেবে নেওয়া যাবে। অর্থাৎ সেই অসীম সংখ্যামালা কে গন্তব্য-সংখ্যার সমতুল্য ভাবা যাবে।

মাধবাচার্য্য এমন অনেক পথ (অনেক infinite sequence) খুঁজে বার করেছিলেন যাদের উপান্তে যে সংখ্যারা দাঁড়িয়ে তাদের মানুষ ভালো করে চেনে না।

কিরকম।

একটা বৃত্ত আঁকো। বৃত্তের পরীসীমাকে তুমি বৃত্তের ব্যাসার্ধর নিরিখে মাপতে পারবে?

ব্যাসার্ধ সরল রেখা। মাপা যাবে। তার নিরিখে যদি বৃত্তের বাঁকা রেখা কে মাপা যায়, তাহলে বক্রতাকে সারল্য দিয়ে ছুঁয়ে ফেলা সম্ভব!

'নিরিখে' মাপা যাবে মানে?

ধর ব্যাসার্ধকে দশ টুকরোতে ভাগ করলে। এই মাপের ষাটটা টুকরো নিলে। যদি বৃত্তের পরীসীমাকে টান টান করে দাও তবে তা এই ষাট টুকরোর চেয়ে একটু বড় হবে। বাষট্টি টুকরোর চেয়েও বড় হবে। কিন্তু ৬৩ টুকরোর চেয়ে ছোটো হবে।

তুমি আবার চেষ্টা করতে পারো। এই তেষট্টি তম টুকরোটাকে দশ ভাগে ভাগ করে, তার থেকে কতক গুলো নেওয়া যায়। কিন্তু আটটা নেওয়ার পর নয় নম্বরটা বসানো যাবে না। একটু কম হবে। আটের চেয়ে বেশি। নয়ের চেয়ে কম।

এমনি করে ক্রমাগত করে যেতে হবে। কিছুতেই শেষ হবে না মাপা।

মাধবাচার্য্য বললেন মাপার দরকার নেই। এই অসীম সংখ্যক মাপকেই পরীসীমার মাপ হিসেবে ধরতে হবে। এই অসীম সংখ্যামালাকেই গন্তব্য সংখ্যা হিসেবে কল্পনা করতে হবে।

চিন্তার জগৎ-এ এক বিপ্লব এসে পড়লো! সসীম সংখ্যাকে অসীম সংখ্যামালা হিসেবে ভাবতে হবে! এ যেন চরৈবেতি-র নতুন ব্যাখ্যা!

শেষ কথা

গণিত করতে করতে মনে হয় যে কল্পনা যেখানে থই খুঁজে পায় না, যুক্তি তাকে সেখানে পথ খুঁজতে সাহায্য করতে পারে। এ কথাটা সাধারণ ভাবে আমরা ভাবি না।

যুক্তিকে বড়ো কাঠখোট্টা ভদ্রলোকের মত মনে হয়। কল্পনা তার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকা এক অস্থির মতি বালিকা। সে যেন রেবা নদীর তীরে ছুটোছুটি করে খেলছে। আর যুক্তি তাকে বকাবকি করছে। শাসনে রাখতে চাইছে।

অথচ ব্যাপারটা হয়ত একটু অন্যরকম। হয়ত কল্পনা এক বৃত্তে ছুটে চলেছে। যুক্তি সেখানে এক দরবেশের মত এসে হাজির। সে তাকে নতুন পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে আরও উন্মুক্ত অস্থিরতায়।

আর আমরা যারা পড়ুয়া তারা মালবিকার মত অনিমিখে তাকিয়ে থাকব পথের দিকে। কে জানে অগ্নিমিত্র আসবেন কিনা!

আরো পড়তে পারোঃ

  1. Cantor's Diagonalization Argument
  2. Gromov Boundary
  3. Madhava-Gregory series

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Cheenta. Passion for Mathematics

Advanced Mathematical Science. Taught by olympians, researchers and true masters of the subject.
JOIN TRIAL
support@cheenta.com