২১শে ফেব্রুয়ারী দিনটা বড় আবেগের- মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস । প্রত্যেক মানুষের মনেই নিজের মাতৃভাষার জন্যে আলাদা একটি জায়গা আছে , তা তিনি যতই কর্মসূত্রে প্রবাসী বা ভিনদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে থাকুন না কেন !

বাঙালির একটা নিজস্ব মিষ্টি অভিযোগ আছে, যে গড়পরতা বাঙালি অঙ্ককে ভয় পায় এবং সে বিজ্ঞান বা অঙ্কের চেয়ে সাহিত্য, শিল্পকর্মে বেশি দক্ষ । যদিও বা বিজ্ঞান ,অঙ্ক নিয়ে কথা ওঠে , তখন আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু হয়ে প্রশান্ত চন্দ্র মহালানবিসে এসে থেমে যায় ।
আমরা এই লেখাটিতে তিনজন বাঙালি গণিতজ্ঞর কথা বলব , যাদেরকে আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি।

আপনাদের কাছে আমার বিশেষ আবেদন, বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি গণিতজ্ঞ এবং তাঁদের গাণিতিক কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে যদি কিছু জেনে থাকেন তাহলে অবশ্যই জানাবেন। আমি সময় হিসাবে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষকে বেছে নিয়েছি।

রাধানাথ শিকদার (১৮১৩ খ্রিঃ – ১৮৭০ খ্রিঃ)

রাধানাথ শিকদার-নামটার সাথে আমাদের এক লাইনের পরিচয় ভূগোল বইয়ে- প্রথম মানুষ যিনি মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা পরিমাপ করেছিলেন ।
সময়টা ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দ , তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল জর্জ এভারেস্ট ‘গ্রেট ত্রিগোনমেট্রিক সার্ভে’-র জন্য দক্ষিণ ভারত থেকে নেপাল পর্যন্ত বিস্তৃত দ্রাঘিমাংশীয় চাপের সঠিক পরিমাপ করতে চাইছিলেন অর্থাৎ বর্তমান গণিতের ভাষায় জিওডেসিকের আকার জানতে চাইছিলেন । আর এই কাজের জন্যে বক্রতলসংক্রান্ত জ্যামিতি এবং গোলকীয় ত্রিকোণমিতি জানা এক গণিতজ্ঞ প্রয়োজন ছিল । তিনি শরণাপন্ন হলেন কলকাতার হিন্দু কলেজের (বর্তমানের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) গণিতের অধ্যাপক জন টাইটালারের । জন টাইটালার ভাবলেন, তাঁর প্রিয়তম ছাত্র – নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’, ইউক্লিডের ‘এলিমেন্ট’ , টাইকো ব্রাহে, কেপলার পড়া রাধানাথের কথা । রাধানাথ ওই সময়েই দুটি বৃত্তের উপর স্পর্শক আঁকবার পদ্ধতি নিয়ে গবেষনাপত্র প্রকাশ করেছিলেন । কাজে যোগ দেবার পর নিজের বক্রতলসংক্রান্ত জ্যামিতিক জ্ঞানকে আরও শানিয়ে তুললেন ।
১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে জর্জ এভারেস্টের উত্তরসূরি কর্নেল অ্যান্দ্রু স্কট ওয়া’র অধীনে হিমালয় পর্বতমালার XV শৃ্ঙ্গটির ছ’টি রিডিং পর্যবেক্ষণ করেন । ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান XV শৃ্ঙ্গটি , পুরানো মাপ অনুযায়ী সর্বোচ্চ শৃ্ঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়েও উঁচু -২৯,০০০ ফুট ।
এই XV শৃ্ঙ্গটির নামকরণ হয় জর্জ এভারেস্টের নাম অনুসারে- আর রাজশক্তির ‘বদ্যানতায়’ উপেক্ষিত থেকে যান রাধানাথ শিকদার, সঙ্গে উপেক্ষিত হয় তাঁর সমস্ত গাণিতিক কর্মাবলী ।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় (১৮৬৪ খ্রিঃ-১৯২৪ খ্রিঃ)

বাংলার বাঘ- শুনলেই মনে আসে একটি নাম, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় । আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ ।
শিক্ষাবিদ, দক্ষ প্রশাসক , আইনজীবী – এই সব পরিচয়ের মাঝে যেন হারিয়ে গেছেন গণিতজ্ঞ আশুতোষ মুখোপাধ্যায় । স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রথাকাকালীনই ইউক্লিডের বিখ্যাত বই ‘এলিমেন্ট’র ২৫তম বিবৃত্তির একটি অন্য ধরণের প্রমাণ প্রকাশ করেন । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পরীক্ষায় গণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন এবং পরের বছর, ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে পদার্থবিদ্যায় এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ওই বছরই উপবৃত্তীয় অপেক্ষকের উপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন । এই কাজটির জন্যে বিখ্যাত ইংরেজ গণিতজ্ঞ আর্থার কেলি ভূয়সী প্রশংসা করেন । মাত্র ২২ বছর বয়সে এডিনবরার রয়্যাল সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন । এছাড়াও পিলার্ম​ ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটি, লন্ডন ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটি সহ এই ধরণের বহু সঙ্ঘ-সমিতির সদস্যপদ লাভ করেছিলেন । তিনিই প্রথম গণিতজ্ঞ যিনি ত্রিমাত্রিক অন্তরকলজের জ্যামিতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছিলেন । গণিতজ্ঞ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিখ্যাত অবদান হল – সমনাভিবিশিষ্ট উপবৃত্তগুলির দ্বারা তৈরি একটি সিস্টেমেরএ(উদাঃ সৌরজগৎ) আবক্র পথ নির্ণয় সংক্রান্ত গবেষণা । এছাড়াও তাঁর ডিফারেনসিয়াল জ্যামিতিতে অবদান এবং ক্যালকাটা ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটি র প্রতিষ্ঠা বিশেষ উল্লেখযোগ্য ।
এখানে একটা কথা না বলে থাকা যায় না, সেটি হল বাংলাভাষার জন্য নিরলস সংগ্রাম । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আশুতোষ মিউজয়ম অব আর্টস’ হলে ওনার ব্রোঞ্জমূর্তির নিচে লেখা কথাটি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি ।
“His noblest achievement, surest of them all/ A place for his mother tongue – in step mother’s hall.”

বিভূতিভূষণ দত্ত (১৮৮৮ খ্রিঃ – ১৯৫৮ খ্রিঃ )

ভারতীয় গণিতের ইতিহাস নিয়ে যখন কথা ওঠে, তখন সবচেয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসাবে উঠে আসে একটি নাম “History of Hindu Mathematics: A Source Book“। এই বইটির সাথে জড়িত আছে আর এক বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি গণিতজ্ঞ – বিভূতিভূষণ দত্ত ।

ছোট থেকেই ছিলেন সন্ন্যাসীমনোভাবাপন্ন । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ পড়াকালীন পরীক্ষার আগে হরিদ্বার চলে গিয়েছিলেন সন্ন্যাস নেবেন বলে । সেখান থেকে ফিরে
এম. এ-তে অসম্ভব ভালো ফলাফল করেছিলেন । তিনি কাজ করেছেন মুলত ফলিত গণিত নিয়ে । ১৯১০-১২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ক্যালকাটা ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল স্থিতিস্থাপকতা তত্ত্ব এবং ঘূর্ণিয়মাণ তরলের ভর নিয়ে লেখা দু’টি গবেষনাপত্র । হাইড্রোডাইনামিক্স বা উদগতিবিদ্যা নিয়ে প্রকাশ করেছেন অনেকগুলি গবেষনাপত্র ।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার সময়, শাল্ব-সুত্রের উপর লেখা প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই । ১৯৩৩ খ্রিঃ তিনি History of Hindu Mathematics তিন খণ্ডের পাণ্ডুলিপি অনুজ সহকর্মী এ.এন. সিংহের তুলে দেন । যেগুলি প্রকাশিত হবার পর হয়ে ওঠে ভারতীয় গণিতের ইতিহাসের আকর গ্রন্থ । তিনি শেষজীবনে পুরোপুরিভাবে সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেছিলেন ।

পরিশিষ্ট

এখানে একটা প্রশ্ন প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে আসে- ওনারা তো সমস্ত কাজটাই ইংরেজি ভাষাতে করেছেন তো বাংলাভাষায় গণিতচর্চায় এদের অবদান কোথায় ?
এর উত্তরে আমি বলব- ওনারা আমাদের অনবরত সাহস জুগিয়ে চলেছেন যে, বাঙালি গণিতশাস্ত্রেও শিল্প সাহিত্যের মতনই পারদর্শী হতে পারে ।
বাংলাভাষায় গণিতচর্চার কথাই যখন উঠল, তখন বলি বাংলাদেশ বা ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ নামের অঙ্গরাজ্য অথবা বহুদিন ধরে প্রবাসে থাকা বাঙালিই হোক – তাদের মধ্যে মরমী কিছু মানুষ অবিরাম চেষ্টা করে চলেছেন । শুধু তাদের চেষ্টাই যথেষ্ট নয় , এগিয়ে আসুন আপনিও ।
শেষ করি প্রতুল চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ও গাওয়া গানের অংশবিশেষ দিয়ে এবং স্বপ্নদেখি বাংলাভাষায় গণিতচর্চার।

আমি যা’কিছু মহান বরণ করেছি বিনম্র শ্রদ্ধায়
মেশে তেরো নদী সাত সাগরের জল গঙ্গায় পদ্মায়
বাংলা আমার তৃষ্ণার জল তৃপ্ত শেষ চুমুক
আমি একবার দেখি, বারবার দেখি, দেখি বাংলার মুখ |


ঋণস্বীকার : লেখার সাহস যোগানোর জন্য অশনি দাসগুপ্ত স্যার, সৃজিত মুখার্জ্জী এবং ক্রমাগত উৎসাহ দেবার জন্যে বন্ধু শুভজ্যোতি মজুমদারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ ।